সকাল আটটা বাজে। সহজ তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। তার বয়স তেরো বছর। এই বয়সে ছেলে-মেয়েদের জীবনে অনেক পরিবর্তন ঘটে।
কলকাতার এক অতি পুরোনো বাড়ি সস্তায় পেয়ে তার বাবা অভয় শর্মা ও মা পরমা শর্মা সেটি কিনেছিলেন। নবদ্বীপের ছেলে অভয় পুলিশের চাকরির সূত্রে বহুবার বদলি হয়েছেন। অনেক ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে কলকাতায় পোস্টিং হয়েছে তার। কলকাতায় ফ্ল্যাট নিয়ে থাকার কথাই তারা ভেবেছিলেন। কিন্তু একটি গুরুতর সমস্যার কারণে এই পুরোনো বাড়িটি তারা কিনেছিলেন।
বাড়িটা বেশ বড়, তবে বাড়ির ভিতর কেমন যেন গা ছমছম পরিবেশ। অভয় ও পরমা এসব বিষয়ে গুরুত্ব না দিলেও তেরো বছরের সহজ এই বাড়িটিকে অত সহজভাবে নেয়নি। তার বাবাকে অনেকবার সে বলেছে, “বাবা, এই বাড়িতে আমার ভয় লাগে। দম বন্ধ হয়ে যায়। একদম ভালো লাগে না। আমরা কি অন্য কোনো বাড়ি কিনতে পারি না?”
তার প্রশ্নের উত্তরে বাবা অভয় বলেছিলেন, “না, আমার এখন নতুন বাড়ি কেনার পরিস্থিতি নেই। তা ছাড়া লোক যা-ই বলুক, আমার মনে হয় না এই বাড়িতে কোনো সমস্যা আছে। পুরোনো বাড়ি, তাই একটু ভাঙাচোরা এবং মাকড়সার জাল এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে।”
বাবার উত্তরে সহজ একেবারে চুপ করে যায়।
সকাল নটার সময় ঘুম থেকে উঠে সহজ স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যায়। যাওয়ার সময় হঠাৎ বহুদূর থেকে আসা একটা চিৎকার তার কানে ভেসে আসে। কিন্তু অন্য কেউ শুনতে পায় না। ফলে তার মনে হয়, এটা মনের ভুল। তাই সে কিছু না বলে স্কুলে চলে যায়।
সারাদিন খুব আনন্দে কাটে তার। মা পরমা তার পছন্দের রান্না করেন—বিরিয়ানি, মটন কষা ও ফিশ কাটলেট। বাড়ি ফিরে খাবারের গন্ধে সে একেবারে পাগলের মতো হয়ে যায়। মাকে বলে, “মা, তুমি আজ আমার পছন্দের খাবার করেছ? আমি খুব খুশি। আমার খুব খিদে পেয়েছে। এখনই খেতে দাও।”
পরমা শর্মা ও তার ছেলে সহজ খুব মজা করে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়।
সন্ধ্যেবেলা সহজ নিজের ঘরে পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে, তা বুঝতেই পারে না। যখন তার ঘুম ভাঙে, তখন রাত দশটা বাজে। মা, বাবা ও সহজ একসঙ্গে রাতের খাবার সেরে বিছানায় যায়।
সহজের ঘুম আসতে চায় না। বই পড়ে দু’ঘণ্টা কেটে যায়। হঠাৎ আবার সেই আওয়াজটা সহজ শুনতে পায়। তার মনে হয়, ঘরের মেঝের নিচ থেকেই এই আওয়াজটা আসছে। কিন্তু মেঝের নিচে কী থাকতে পারে!
পরদিন সকালে সহজ তার মাকে সব বলে।
“জানো মা, কাল একটা ঘটনা ঘটেছে। তখন গভীর রাত। খাটে এপাশ-ওপাশ করছিলাম। হঠাৎ যেন মেঝে থেকে উঠে এল আওয়াজটা। কিন্তু কিসের আওয়াজ, তা আমি বুঝতে পারিনি। মানুষ না কোনো বন্য জন্তু, তাও আমি বলতে পারব না। তবে আমার মন বলছে, এই বাড়িতে কিছু একটা আছে।”
তার কথা শুনে মা ভয় পান। বাবা অভয়বাবু বাড়ি ফিরলে তাকে সব বলেন তিনি। তিনজন মিলে ঘরের মধ্যে অনেক খোঁজাখুঁজি করে। সহজ দেখে, খাটের নিচে এক জায়গার মেঝে ফাঁপা। সেটা সরিয়ে তারা দেখে, মাটির নিচের দিকে একটা সিঁড়ি চলে গেছে।
টর্চ নিয়ে অভয়বাবু সেই মুহূর্তেই অন্ধকারে যাওয়ার উপক্রম করেন। কিন্তু পরমা ও সহজ তাকে বারণ করে। কারও কোনো কথা না শুনে তিনি সাহস করে বন্দুক সঙ্গে নিয়ে সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে প্রবেশ করেন।
এবার আওয়াজ শুনতে পান তিনিও। যতই এগিয়ে যান, ততই আওয়াজটা বাড়তে থাকে। কিন্তু কোনো কিছুই দেখতে পান না তিনি। এই সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়, তা তিনি না জানায় টর্চ জ্বেলে উপরে উঠে আসেন।
পরদিন পাশের বাড়ির একজনকে ঘটনাটি বললে, ওই বাড়ির রহস্য তিনি অভয়বাবুর সামনে উন্মোচন করেন।
“এই বাড়ির প্রকৃত মালিককে বহু বছর আগে হত্যা করে ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তার আত্মা এখনো ওই বাড়িতে দেখা যায়। তার চিৎকার এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায়। এর আগে ওই বাড়িটি কম করে দশজন ব্যক্তি কিনেছিলেন, কিন্তু কেউই বেশিদিন থাকতে পারেননি।”
ওই ব্যক্তির কথা শুনে খুবই ভয় পান অভয়বাবুরা।
অভয় শর্মা বুঝতে পারেন, তার ছেলে সহজ অনেক আগেই এই বাড়ির রহস্য ঠিক বুঝতে পেরেছিল। সে তার কথায় তখন গুরুত্ব দেননি। এটা তার ভুল হয়েছে। তিনি এ-ও বুঝতে পারেন যে, এই বাড়িতে আর থাকা যাবে না।
এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়িটি বিক্রি করে তারা নতুন একটি ফ্ল্যাট কেনেন।
পুনরায় সেই রহস্যময় বাড়িটি মালিকহীন হয়ে পড়ে। নতুন কোনো মালিকের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে সেই ভূতের বাড়িটি।
