আমি একা। আমার স্ত্রী বাইরে চাকরি করেন। ফ্ল্যাটে আমি একাই থাকি। ঘর থেকে খুব একটা বের হই না। বাইরে খুব গরম। জানলার কাছে বসে থাকি অমলের মতো। দশতলা ফ্ল্যাটের জানালা।
তা একদিন একটা মেঘ টুক করে ঢুকে পড়ল আমার ঘরে। আমি চমকে উঠলাম। বললাম, “ওহে, তুমি আমার ঘরে ঢুকলে কেন?”
মেঘ হেসে বলল, “তোমার সঙ্গে একটু গল্প করব।”
“কিসের গল্প করবে তুমি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মেঘ সরু গলায় বলল, “রোজ দেখি তুমি মন খারাপ করে জানলার কাছে বসে থাকো। তুমি কী ভাবো বলো তো?”
“কী ভাবব? এতদিন চাকরি করেছি। ভাবার সময় পাইনি। খুব ব্যস্ত থাকতাম। এখন রিটায়ার করেছি। কোনো কাজ নেই, তাই বসে বসে নতুন নতুন কথা ভাবি। কথা বলার তো কেউ নেই।”
“কেন? ছেলেমেয়ে নেই?”
“না। কোনো সন্তান নেই আমার।”
মেঘ একটু অবাক হয়ে বলল, “তার জন্য দুঃখ করছ?”
“কেন, তোমাদের জীবনেও আবার দুঃখ আছে নাকি?”
“কেন? মেঘেদের বুঝি দুঃখ থাকতে নেই? দুঃখ শুধু মানুষের?”
“ভুল বুঝো না আমাকে। আমি সে কথা বলিনি। তোমরা তো ভেসে বেড়াও—এদেশ থেকে ওদেশ, এক জেলা থেকে আর এক জেলা। নতুন নতুন দেশ দেখো, নতুন জীবন দেখো। তোফা জীবন তোমাদের। যাতায়াতে কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। ভিসা, পাসপোর্ট—এসব কিছুই লাগে না।”
“তা টাকা লাগে না বটে, পাসপোর্টও লাগে না সত্যি। কিন্তু বাতাসকে খুব তোষামোদ করতে হয়, সেটা জানো কি? না হলে ভেসে বেড়াই কী করে?”
“তা বুঝলাম। বাতাস ছাড়া তোমরা উড়তে পারো না। কিন্তু দুঃখটা কোথায়, সেটা তো বুঝলাম না।”
মেঘ একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, “দুঃখটা কোথায় শুনবে? আমাদের ডিউটি ওলটপালট হয়ে গেছে। নতুন করে নতুন ডিউটি দিচ্ছে।”
“কী রকম?”
“আগে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বৃষ্টি দিতাম। সারা বছর তেমন কোনো কাজকর্ম থাকত না। নিজেদের মধ্যে সুখ-দুঃখের গল্প করার অবকাশ পেতাম। আর এখন? কোনো টাইম টেবিল নেই। পৌষ মাসে বৃষ্টি দিচ্ছি। মাঘ মাসও বাদ যাচ্ছে না। যে কোনো সময় বৃষ্টি দিতে হচ্ছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে। সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের বড় কষ্ট, বুঝলে।”
“কে এই সর্বনাশটা করল তো?”
“কেন, তুমি জানো না বুঝি? তুমি রিটায়ার করেছ বললে। তার মানে ষাট বছর বয়স পার করেছ। এই সর্বনাশটা করেছে মানুষ। আর কে করবে? গাছপালা সব কেটেছে। পুকুর-দীঘি ভরাট করে আকাশছোঁয়া সব ফ্ল্যাটবাড়ি তুলেছে। এই তোমাদের বাড়িটাই ধর না—এখানে আগে একটা দীঘি ছিল। পদ্মফুল ফুটত। সেই পদ্মের মাথায় ভ্রমর বসত, মধু খেত। এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক দৈত্যকায় প্রাসাদ। আমরা আর থাকব না।”
“তাহলে পৃথিবী স্নান করবে না? জমিতে ফসল হবে না?”
“বৃষ্টি হলে তো পৃথিবী স্নান করবে, জমিতে ফসল হবে।”
“কবিরা যে মেঘ নিয়ে কত কবিতা, গান, গল্প লিখত, তা আর লেখা হবে না?”
“আর লিখতে পারবে না।”
“মেঘ করলে ময়ূর যে পেখম তুলে নাচত, কী অপূর্ব সেই দৃশ্য! তা আর মানুষ দেখতে পারবে না?”
“না।”
“বর্ষাকে ঘিরে যে বর্ষা উৎসব হতো, তা আর হবে না?”
“না।”
“তা হলে এই পৃথিবীটার কী অবস্থা হবে?”
“মরু পৃথিবীটাকে গিলে খাবে। তবে একটা উপায় আছে।”
“কী?”
“গাছেদের সঙ্গে আমাদের নতুন করে প্রেম করতে হবে। আর পুকুর, নদী, দীঘির সঙ্গে নতুন করে করতে হবে বন্ধুত্ব।”
“হ্যাঁ, আমি জানি।”
“তা তুমি যখন জানো, মানুষকে এই কথা কেন বলোনি এতদিন?”
“মানুষ শোনে না। আবার নতুন করে মানুষকে বোঝাতে হবে।”
“তুমি এতদিন কী কাজ করতে?”
“স্কুলে পড়াতাম।”
“মাস্টার! তা কোন বিষয় পড়াতে?”
“পরিবেশ বিজ্ঞান।”
“আসল অমানুষ তো তুমি।” মেঘ স্পষ্ট গলায় বলল।
আমি এতটুকু রাগ না করে বললাম, “তা বলতে পারো। আমারই ব্যর্থতা।”
“এ কথা বলে তুমি দায়িত্ব এড়াতে পারো না।”
মেঘ চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল।
“আমাকে কী করতে হবে বলো। তাই করব। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব।”
“মানুষকে নতুন করে বোঝাতে হবে—গাছ, পুকুর, নদী, পাখি, দীঘি—এদের বাঁচাতে হবে। না হলে আমরাই বাঁচব না।”
“সেটাই তো পাড়ার প্রকৃতিবাবু বোঝাতে চেয়েছিলেন। অকালে প্রাণটা গেল।”
“কী রকম?” মেঘ হঠাৎ আবার চেয়ারে বসল।
“ঐ তো সোনা কাকাদের বাড়ির সামনের বকুল গাছটা কেটে ফ্ল্যাটবাড়ি তুলেছিল এক প্রোমোটার। প্রকৃতিবাবু প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল।”
“পুলিশ-প্রশাসন কিছু করল না?” মেঘ কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল।
“প্রোমোটারদের লম্বা হাত। সেই হাতের আদর খায় সবাই।”
“তাই বুঝি?” মেঘ একটু ঝুঁকে পড়ে বলল।
“তা হলে আর বলছি কেন?”
“এবার এরকম কিছু দেখলে তুমি প্রতিবাদ করবে।”
“আমারও প্রকৃতিবাবুর মতো অবস্থা হবে।”
“তুমি মরতে ভয় পাও? একদিন তো মরতে হবেই। ভালো কাজ করে মরলে লোকে মনে রাখবে। তবু বাধা দেবে।”
“মেঘ ভাই, তুমি কিছু করতে পার না?”
“আমি? আচ্ছা, ঐ প্রোমোটারদের ছবি আমাকে দিও তো।”
“ছবি দেখে তুমি কী করবে?”
“ছবি দাও না আগে। দেখো, তারপর কী করি আমি।”
একদিন মেঘ এসে ছবিগুলো নিয়ে গেল। আর সে এল না।
আমি জানালার ধারে বসে অপেক্ষা করি। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায়—মেঘ আসে না। তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাটা মনে মনে আওড়াই—“কেউ কথা রাখেনি।” সঙ্গে সঙ্গে দেখি মেঘ ঢুকে পড়েছে ঘরে।
বললাম, “এতদিন কোথায় ছিলে?”
মেঘ বলল, “চেরাপুঞ্জি। ওখানে ডিউটি পড়েছিল।”
দুই
আশ্চর্য, তারপর থেকে প্রোমোটাররা কোনো গাছ কাটেনি। পুকুর ভরাট করেনি।
অনেক দিন পর মেঘ এল।
বললাম, “ব্যাপারটা কী?”
“আমি প্রোমোটারদের সঙ্গে মিটিং করলাম।”
“প্রোমোটারদের সঙ্গে মিটিং?”
“হ্যাঁ, মিটিং। তাদের বললাম, প্রকৃতি বাঁচিয়ে নতুন করে ঘরবাড়ি গড়বে। তা না করলে ঝড়-বৃষ্টি দিয়ে সব পণ্ড করে দেব। ওরা বলল, ‘আমরা নতুন করে সব শুরু করব।’”
