তুলতুলি মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরল বকা খেতে খেতে। মা বলছেন, “সারাদিন শুধু টইটই। অন্য সব বিষয় মুখস্থ করে চলে যায়, কিন্তু তুই অঙ্কও মুখস্থ করবি? তোকে কত করে বোঝাই, ক্লাসে ম্যাডামও বোঝান, তবু তোর বুঝতে কিসের অসুবিধে, আমি তো বুঝি না।”
পাশের বাড়ির দাদু বারান্দায় বসে কাগজ পড়ছিলেন। বকাঝকা শুনে ভিতরে গিয়ে দিদাকে বললেন, “কী ব্যাপার বলো তো, তুলতুলিকে রুমা অত বকছে কেন?”
দিদা বললেন, “হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার খাতা দেখিয়েছে আজ বাবা-মায়েদের। অঙ্কে কম পেয়েছে নিশ্চয়ই। তাই বকা খাচ্ছে। এখন থাক, বিকেলে কথা বলব।”
তুলতুলি ক্লাস ওয়ানে পড়ে। আজ হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার খাতা দেখিয়েছে। সব বিষয়ে ভালোই ফল করেছে, শুধু অঙ্কে অনেক কম পেয়েছে। অনেকগুলো বোকার মতো ভুল করেছে। তাই মা বকা দিচ্ছেন।
বিকেলে তুলতুলি বাগানে বসে রাস্তা দেখছিল। পাশের বাড়ির দাদু-দিদা গেট খুলে ঢুকলেন। দিদা মায়ের কাছে গিয়ে বকাবকির কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। দাদু তুলতুলির পাশে বসে পড়লেন।
বললেন, “দিদিভাই, তুমি সব বিষয়ে ভালো ফল করো, অঙ্কে কেন পারো না?”
তুলতুলি ছলছল চোখদুটো তুলে বলল, “দাদু, অঙ্ক আমার ভালো লাগে না। ক্লাসে মিস কী পড়ান, কিছুই বুঝি না। মা ক্লাসের অঙ্কগুলো বারবার প্র্যাকটিস করায়, তখন পারি। আর পরীক্ষায় মিস কিসব অঙ্ক দিয়ে দিলেন, সব ভুল হয়ে গেল।”
দাদু বললেন, “কেন, তুমি অঙ্ক না বুঝে মুখস্থ করো?”
“না, দাদু। আমি কোনটা গুণ, কোনটা ভাগ—কিছুই বুঝি না,” তুলতুলি বলল।
দাদু বললেন, “যখন তোমাকে একটার বিষয়ে বলে অনেকগুলোর মোট কত হবে জিজ্ঞাসা করবে, তখন গুণ হবে। আর অনেকগুলোর মোট পরিমাণ বলে একটার কত মাপ জানতে চাইবে, তখন ভাগ হবে।”
তুলতুলি বলল, “দাদু, তুমি কত সহজ করে বুঝিয়ে দিলে! এইভাবে কেউ দেয় না।”
ওরা যখন এইরকম কথা বলছে, তখন দিদা আর মা-ও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
দিদা বললেন, “তোর দাদুও ছোটবেলায় অঙ্কে কাঁচা ছিলেন। সে গল্প দাদুকে জিজ্ঞাসা কর।”
দাদু মৃদু হেসে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, সে এক কাণ্ড। সেও হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা। আমি অঙ্কে ১০০-য় ১০ পেয়েছি। বাবার ভয়ে ১০-এর পরে একটা শূন্য বসিয়ে ১০০ করে নিয়ে এসেছি। মা তো অত বুঝতে পারেননি। লাল কালির পাশে নীল কালি দেখে জিজ্ঞাসা করাতে বললাম, মাস্টারের পেনের কালি শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাবাকে কি এত সহজে বোঝানো যায়? ওদিকে অঙ্কের মাস্টারের সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছে। তিনিও আমার অঙ্কে ১০ পাওয়ার কথাটা বলে দিয়েছেন। ফলে যা হওয়ার তাই হল।”
তুলতুলি বড় বড় চোখ করে শুনছিল। ও বলল, “কী হল?”
দাদু বললেন, “বাবা এসে আমায় উত্তম-মধ্যম দিলেন। এক তো ১০ পেয়েছি, আর দ্বিতীয়ত আমি আবার সেটাকে ১০০ করেছি। সারারাত কাঁদলাম। তারপর ঠিক করলাম, কী জানো দিদিভাই?”
তুলতুলি বলল, “কী গো দাদু?”
দাদু বললেন, “অন্য কেউ হলে অঙ্কের ওপর রেগে গিয়ে অঙ্ক করাই ছেড়ে দিত।”
তুলতুলি বলল, “ঠিকই তো। আমারও তো তাই মনে হচ্ছে।”
দাদু বললেন, “কিন্তু তুমি ছাড়তে চাইলেই কি অঙ্ক তোমায় ছাড়বে? তাই আমি ঠিক করলাম, যে অঙ্ক আমায় জব্দ করেছে, তাকে আমি শিখেই ছাড়ব। অঙ্ককেই আমি জব্দ করব।”
তুলতুলি বলল, “তারপর জব্দ করলে?”
এবার দিদা বললেন, “করেননি আবার! সেই অঙ্ককে জব্দ করার ইচ্ছায় উনি শেষপর্যন্ত নামী কলেজের অঙ্কের প্রফেসর হয়ে গেলেন, জানো দিদিভাই।”
তুলতুলি এত্ত বড়ো হাঁ করে ফেলল। ও দাদুর হাত ধরে টানতে টানতে বলল, “দাদু, আমিও অঙ্ককে জব্দ করব। আমাকেও শিখিয়ে দাও।”
তারপর বাবা-মার সম্মতিতে তুলতুলি দাদুর কাছে অঙ্ক শিখতে লাগল।
এইভাবেই শুরু হল তুলতুলি আর অঙ্কের বন্ধুত্ব। বার্ষিক পরীক্ষায় তুলতুলি অঙ্কে পুরো নম্বর পেল।
তারপর অনেক বছর কেটে গেল। এখন তুলতুলিও বড় হয়েছে। অঙ্ক তার প্রিয় বিষয়। অঙ্ক নিয়ে সে যদিও পড়াশোনা করেনি, তবে অঙ্কের প্রিয় বন্ধু Computer Science নিয়ে পড়াশোনা করেছে। আর এটুকু বুঝে গেছে যে, অঙ্ক ছাড়া সবই অচল। সব বিষয়েই অঙ্কের ব্যবহার আছে, তা সে প্রত্যক্ষ হোক বা পরোক্ষ।
তাই অঙ্ক এখন তুলতুলির প্রিয় বন্ধু।
