গ্রামের নাম ভুতুড়িয়া। আর সেই গ্রামের সবচেয়ে বড় ‘ট্যাঁশ গরু’ মানে ভীতু ছেলে হল পল্টু। দিনের বেলায় পল্টুর মুখে খই ফোটে, কিন্তু রাত আটটা বাজলেই রাম নাম জপতে জপতে বাথরুম যায়। সেদিন বিকেলে করিম চাচার চায়ের দোকানে বসে পল্টু খুব ফুটানি মারছিল।
-আরে ধুর, ভূত বলে কিচ্ছু নেই। ওসব তোদের মতো ভীতু ডিমদের কল্পনা। আমি তো রাতে ভূতের সঙ্গে বসে লুডো খেলি।
করিম চাচা চা বানাতে বানাতে বললেন,
-বটে! এতই যদি সাহস, তবে আজ রাত বারোটায় হাড়কাটা পুকুরের পাড়ে গিয়ে ওই পুরনো তেঁতুল গাছটায় একটা পেরেক পুঁতে আয় তো দেখি! পারলে কাল থেকে তোর চা ফ্রি।
ব্যস, ফ্রি-তে চায়ের লোভে পল্টু রাজি হয়ে গেল।
রাত ঠিক বারোটা। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে চাঁদের টিকিও নেই। পল্টু একহাতে একটা টর্চ, আর অন্য হাতে একটা পেরেক ও হাতুড়ি নিয়ে হাড়কাটা পুকুরের দিকে চলল। পল্টুর হাঁটু দুটো থরথর করে কাঁপছে। পুকুরপাড়ে আসতেই ঝিঁঝি পোকাগুলো ডাক বন্ধ করে দিল। একটা প্যাঁচা বিকট শব্দে ডেকে উঠল, ‘খ্যাঁকখ্যাঁকখ্যাঁক!’ পল্টুর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ও বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল,
-ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি... রাম রাম রাম... মুন্নি বদনাম হুয়ি...
ভয়ে মন্ত্র আর সিনেমার গান সব গুলিয়ে খিচুড়ি হয়ে গেল। হঠাৎ পুকুরের পচা কালো জলের মাঝখানটায় ভড়ভড় করে উঠল। পল্টু থমকে দাঁড়াল। বিশ্রী পচা গন্ধ নাকে এল। জল থেকে ধীরে ধীরে উঠে এল একটা সাদা ধোঁয়ার মতো মূর্তি। একমাথা জট পাকানো চুল, গায়ে সাদা শাড়ি। পল্টুর চোখ তো কপালে।
-ওরে বাবা রে, এ তো এক্কেবারে খাঁটি পেত্নী!
পেত্নী জলের ওপর ভাসতে ভাসতে পল্টুর দিকে এগিয়ে আসছে। তার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। পেত্নী খোনা সুরে ডাক দিল,
-অ্যাঁয়্যাঁয়্যাঁ... পঁল্টুউউউঁ... তুঁই এঁসেছিঁস?
পল্টু পালাতে চাইছে। প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলেছে। ঠিক সেই সময় ঘটল সাংঘাতিক কাণ্ড! পেত্নীর গেল শাড়ির কুঁচিতে পা আটকে। সটান মুখ থুবড়ে পড়ল পুকুরপাড়ের প্যাচপ্যাচে কাদার মধ্যে। পল্টু তো থ! পেত্নী আছাড় খেয়েছে, জীবনে কেউ শোনেনি। তার ভয় একটু কমে গেল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কাকিমা... মানে, পেত্নী দিদিমণি, ঠিক আছেন তো? লাগেনি তো?
কাদা মাখা মুখ নিয়ে উঠে দাঁড়াল পেত্নী। রেগেমেগে বলল,
-কাকিমা বলবি না বাঁদর ছেলে। আমি দুশো বছরের পুরনো পেত্নী। একটু রেসপেক্ট দে।
বলতে বলতেই খুক খুক করে কেশে উঠল। পল্টু অবাক,
-আপনার আবার কাশিও হয় নাকি?
পেত্নী নাক টেনে বলল,
-আর বলিস না ভাই, এই পচা ঠান্ডা জলে দুশো বছর ধরে ডুবে আছি। আমার টনসিল ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। তার ওপর জলে যা মশা। ডেঙ্গু হল কি না কে জানে। তোর কাছে ভিক্স বা কফ সিরাপ হবে রে?
পল্টু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পেত্নী চাইছে কফ সিরাপ! হঠাৎ পেত্নী গলা খাঁকারি দিয়ে আবার সেই নাকি সুরে বলে উঠল,
-হাঁউ মাঁউ খাঁউ... আঁমি মাঁনুষের রঁক্ত খাঁই। আঁয়... পঁল্টু... আঁমার কাঁছে আঁয়... তোঁর ঘাঁড় মঁটকে খাঁই।
পল্টু তো খিলখিল করে হেসে উঠল।
-আরে হাসছিস কেন ইডিয়ট? ভয় পা!
পল্টু হাসতে হাসতে বলল,
-আরে ভয় পাব কী, দাঁত তো মাজেন না। আপনার বাঁদিকের দাঁতে তো কচুপাতা আটকে আছে।
পেত্নী লজ্জায় তার এক হাত লম্বা জিভ কেটে নখ দিয়ে দাঁত থেকে কচুপাতা খুঁটতে খুঁটতে বলল,
-ওহ হো, দুপুরে শাঁকচুন্নিটা কচুর লতি দিয়ে ইলিশ মাছ রেঁধেছিল, উফ কী টেস্ট।
দাঁত পরিষ্কার করে পেত্নী এবার সিরিয়াস হল।
-অনেক ইয়ার্কি হয়েছে, এবার তুই জলের নীচে চল।
পেত্নী পল্টুর হাত খপ করে ধরল। বরফের মতো ঠান্ডা হাত। পল্টুর এবার সত্যিই একটু ভয় করল। পেত্নীটা ওকে টানতে টানতে জলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পল্টুও বাঁচার চেষ্টা করছে,
-ছেড়ে দে বলছি!
-ছাড়ব না, চল জলের নীচে!
টানাটানি করতে গিয়ে দুজনেই দড়াম করে পড়ল পুকুরপাড়ের সেই জবজবে কাদার মধ্যে। দুজনের পা-ই কাদায় আটকে গেছে। পেত্নী বলে উঠল,
-উফ, ভাই পল্টু, একটু টেনে তোল না আমাকে। আমার শাড়িটা কাদায় পুরো লেপ্টে গেল। কাল আবার ডাই-ক্লিনিংয়ে দিতে হবে। তোকে ঘাড় মটকাব না প্রমিস, আমাকে তোল।
ফ্যাঁচ করে কেঁদেই ফেলল পেত্নী। ঠিক সেই সময় সেখানে হাজির হলেন করিম চাচা। হাতে হ্যারিকেন আর ছাতা। করিম চাচা ভেবেছিলেন পল্টুকে ঠিক ভূতে ঘাড় মটকাচ্ছে। কিন্তু পুকুরপাড়ে এসে তিনি দেখলেন, কাদার মধ্যে পল্টু আর একটা সাদা শাড়ি পরা পেত্নী একে অপরকে কাদা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। করিম চাচা ভয়ে ‘ওরে বাবারে, ভূত’ বলে নিজের পায়ের একটা কাদা মাখা জুতো খুলে সজোরে ছুড়ে মারলেন পেত্নীর দিকে। জুতোর বাড়ি খেয়ে পেত্নী ফের হাউহাউ করে কেঁদে উঠল,
-ওরে বাবারে, এ কেমন অসভ্য গ্রাম রে বাবা, জুতো মারে। তোদের গ্রামে আমি আর থাকব না। আমি পাশের গ্রামের পুকুরে পালাচ্ছি, তোরা অমানুষ!
পেত্নী কাদা থেকে কোনওরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে, শাড়ি মালকোঁচা মেরে তুলে উল্টোদিকে দৌড় লাগাল। সোজা মাঠের ওপর দিয়ে সে কী দৌড়। করিম চাচা আর পল্টু হাঁ করে সেই দৃশ্য দেখল। তারপর করিম চাচা পল্টুর হাত ধরে কাদা থেকে টেনে তুললেন।
-কিরে পল্টু, পেরেক পুঁতেছিস?
করিম চাচা কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলেন। পল্টু কাদা মাখা মুখে ফিক করে হেসে বলল,
-পেরেক তো পোঁতা হল না চাচা, তবে পেত্নী দিদিমণিকে কচুপাতা বাছতে আর কাদা মাখতে শিখিয়ে দিলাম। কাল সকালে ফ্রি চা, মনে আছে তো!
পরদিন থেকে গ্রামে আর কোনওদিন ভূতের দেখা পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামের লোকেরা বলে, রাতে মাঝে মধ্যে পাশের গ্রাম থেকে নাকি কার খোনা গলা শোনা যায়,
-পঁল্টু ভাঁই, এঁকটু ভিঁক্স হঁবে?
