সকালবেলা মিনুর ঘুম ভাঙল কী যেন একটা গোলমালে। আওয়াজটা বাগানের দিক থেকে আসছে না? ভেজানো দরজা খুলে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এল মিনু।
বাগানে শিউলিতলায় চার-পাঁচজন লোক জড়ো হয়েছে। বাবা আর কাকাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে। মা আর কাম্মা নীচের বারান্দায়। ঠাম্মা চেয়ারে বসে আঁচলে চোখ মুছছেন।
ব্যাপারটা এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে না। ছুটে ছুটে নীচে নামতে গিয়ে ধাক্কা লাগল দাদাভাই বিনুর সঙ্গে।
— কী হচ্ছে বাগানে, দাদাভাই?
— পাঁচিলের ধারের শিউলি আর পেয়ারা গাছদুটো কেটে ফেলা হবে।
— সেকি? কেন? ওরা আবার কী দোষ করেছে? কেটে ফেললে ওদের লাগবে না?
— লাগবে কী রে? কেটে ফেললে ওরা তো মরেই যাবে। তাছাড়া পাশের বাড়ির কাকু থানায় অভিযোগ করেছেন, ওই গাছগুলোর ফুল-পাতা ওদের বাগানে পড়ে বাগান নোংরা করছে। তাই থানা থেকে লোকজন এসেছে গাছ কাটতে।
দাদাভাইয়ের গলা ধরে এল।
— না, না। ওদের কিছুতেই কাটা যাবে না।
একছুটে বাগানে শিউলিতলায় গিয়ে, চোখভরা জল নিয়ে শিউলি গাছটা জড়িয়ে ধরল মিনু।
করাত, কুড়ুল হাতে গাছ কাটার লোকজন থমকে দাঁড়াল। বাবা, কাকাই দৌড়ে এলেন। মা, কাম্মা ছুটে এলেন।
— মিনু মা, চলে এসো মা, বাবা মিষ্টি করে বললেন।
— আমি কোত্থাও যাব না, বাবা। ওদের চলে যেতে বলো।
মা, কাম্মা, কাকাইয়ের অনুনয়-বিনয় মিনুকে একচুলও নড়াতে পারল না। থানার অফিসার বিমানবাবু এগিয়ে এলেন।
— তুমি তো লক্ষ্মী মেয়ে। আমাদের কাজ তো আমাদের করতেই হবে। তুমি কেন গাছ কাটতে বাধা দিচ্ছ?
গাছের গায়ে হেলান দিয়ে এক হাতে চোখ মুছে মিনু প্রশ্ন করল,
— পুলিশকাকু, আজ কত তারিখ জানো কি?
বিমানবাবু অবাক হয়ে বললেন,
— আজ জুন মাসের পাঁচ তারিখ। কেন?
— তোমার মনে নেই আজ কী দিন?
— মনে পড়েছে। আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
— আর তোমরা আজ আমার দুই বন্ধুকে মেরে ফেলতে চাইছ?
— তোমার বন্ধু? কে তোমার বন্ধু?
শিউলিতলা সাদা ফুলে ছেয়ে গেছে। তার মাঝে টুকটুকে লাল ফ্রক পরা মিনু শিউলি গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে আর পেয়ারা গাছের দিকে আঙুল তুলে বলল,
— পুলিশকাকু, এরা আমার বন্ধু। আর বাগানের ছোট-বড় সব গাছ আমার বন্ধু। আমার বন্ধুদের কেউ কিচ্ছু করবে না।
পাশের বাড়ি, যাদের জন্য গাছ কাটতে হচ্ছিল, সে বাড়ির দাদু সঙ্গে দুই নাতি-নাতনি কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন। এগিয়ে এসে বললেন,
— দিদিভাই, আমাদের বড্ড ভুল হয়ে যাচ্ছিল। বুঝতে পেরেছি, অকারণ জেদ করে গাছ কাটা ঠিক নয়। তোমার এই দুই বন্ধুর কথা বলতে আমাদের বাড়ির সকলের মাথায় ঢুকেছে, গাছ কাটার আবেদন করে আমরা ভুল করেছি। পুলিশ অফিসারের কাছেও ক্ষমা চাইছি।
কোনও গাছ কাটা হবে না।
মিনু ছুট্টে এসে দাদুকে জড়িয়ে ধরল।
— দাদু, তুমি আমার বন্ধুদের বাঁচালে। ইউ আর গ্রেট।
দাদুভাই বললেন,
— না, দিদিভাই। গাছ কাটতে বলে অন্যায় করেছি। সে অপরাধ কিছুটা লাঘব করতে আমি কুড়িটা ফুলগাছের চারা এনেছি। তুমি যদি রাজি হও, তবে আমরা সবাই মিলে আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চারাগাছগুলো এই বাগানে বসিয়ে দিই? কী বলেন, পুলিশবাবু, এটা ঠিক শাস্তি তো?
বিমানবাবু হাসিমুখে বললেন,
— মিনু, আমাকেও একটা চারাগাছ লাগাতে দেবে কি?
মিনুর মুখে হাসি।
— সবাই মিলে গাছ লাগাব। জানো না, দিদিমণি বলেছেন, একটি গাছ একটি প্রাণ। গাছ লাগাও, প্রাণ বাঁচাও।
উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে মিনুকে স্বাগত জানাল। বাবা, দাদু, কাকাই, মিনুর দাদা, বন্ধুরা, আবার যারা গাছ কাটতে এসেছিল, সবাই মিলে উৎসাহে গাছ লাগানো শুরু করে দিল।
ঠাম্মা বললেন,
— গাছ লাগিয়ে, গাছে জল দিয়ে সবাই নারকেল নাড়ু খেয়ে তবে বাড়ি যেও।
সবাই আনন্দে আবারও হাততালি দিয়ে উঠল।
