টিঙ্কাদের বাড়িতে কোনো উঠোন নেই। তবে তাদের দোতলায় একটা ব্যালকনি আছে। সেখানে টিঙ্কার ঠাকুমা ছোট-বড় টবে তাঁর নিত্যপুজোর জন্য নয়নতারা, তুলসি, একটা জবা গাছ লাগিয়েছেন। মায়ের লাগানো তরুলতাটা গ্রিল বেয়ে উঠে গেছে অনেকখানি। তাদের যদি একটা বাগান থাকত, তাহলে অনেক গাছ লাগানো যেত। তার ঠাকুমা বলেন, যা নেই তার জন্য আফশোস করতে নেই। বরং যা আছে, তাই দিয়ে ভালো কিছু করার চেষ্টা করাটাই হল কাজের মতো কাজ।
টিঙ্কার প্রিয় ঋতু বর্ষা। জানালার ধারে বসে ঝমঝম বৃষ্টি দেখতে তার খুব ভালো লাগে। গাছগুলো বৃষ্টিতে দোল খেতে খেতে ধারাস্নান করে। সেদিন স্কুল যেতে হয় না। দুপুরে মা খিচুড়ি বানায়। দিনটা বেশ মজায় কাটে।
পরপর তিন দিন বৃষ্টির পর আজ আকাশ বেশ পরিষ্কার। টিঙ্কা স্কুলে চলেছে। তাদের পাড়ার সরু গলি রাস্তাটা পার হলেই বড় রাস্তা। গলি রাস্তাটার পাশে একটা বড় বাগান ছিল। এই জায়গাটা ছায়াময় হয়ে থাকত। সারাদিন পাখিদের কিচিরমিচির শোনা যেত। সেই বাগানটা আর নেই। এখন সেখানে বাড়িঘর হয়ে গেছে। কিছুটা জায়গা ঝোপের আকারে পড়ে আছে। বৃষ্টির জমা জলে রাস্তাটা জল থইথই। ছপছপ করে হাঁটতে বেশ মজা লাগছে টিঙ্কার। তার চোখে পড়ল রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট গাছের চারা একগলা জলে ডুবে আছে। কেবল তার মাথার দুটি পাতা জলের উপর জেগে আছে। একটুখন সেখানে দাঁড়িয়ে টিঙ্কা হাঁটা দিল। তার স্কুলের দেরি হয়ে যাবে। কয়েক পা যেতেই সে শুনতে পেল, কেউ যেন কাতর স্বরে বলছে— 'আমাকে বাঁচাও! আমি ডুবে যাচ্ছি!' আওয়াজটা এতটাই আস্তে, প্রায় শোনাই যায় না।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না টিঙ্কা। দুটো কোলা ব্যাং কচুবনে বসে মনের সুখে গলা সাধছিল। টিঙ্কাকে দেখে 'ছপাৎ' করে লাফিয়ে ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল। একটা ঘাসফড়িং ফরফর করে উড়ে পালাল। টিঙ্কা আর দাঁড়াল না।
স্কুলে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ফের এক পশলা বৃষ্টি। বিজ্ঞানের ক্লাসে সুমিতা দিদিমনি পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করলেন—
'গাছই হল পৃথিবীর আদি বাসিন্দা। বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী আজ থেকে চল্লিশ কোটি বছর আগে গাছেদের দেখা মেলে। সেসব গাছ এখনকার গাছেদের মতো ছিল না। জলে জন্মানো শ্যাওলারাই ক্রমে ডাঙার মাটি আঁকড়ে ধরে উপর দিকে ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল। নাম-পরিচয়হীন সেসব গাছেদের চিহ্ন আজ আর নেই। তারপর সেই থেকে আজ অবধি গাছ আমাদের পরিবেশকে সব দিক দিয়ে রক্ষা করে চলেছে। ফুল, ফল, অক্সিজেন দিয়ে আমাদের গ্রহটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমরা ক'জন সেসব মনে রাখি? এখন চারদিকে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ইট-কাঠের জঙ্গলে ফুরিয়ে যাচ্ছে সবুজ বন। হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর, নদী, ঝর্না। মাটি, জল, বাতাস দূষিত হচ্ছে। গাছেরা বোবা কান্না দিয়ে বোঝাতে চাইছে তাদের কষ্টের কথা। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী একদিন প্রাণহীন একটা গ্রহে পরিণত হবে। আমাদের এই সুন্দর গ্রহটিকে বাঁচাতে, পরিবেশকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে গেলে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। ভালোবাসতে হবে।'
ফেরার সময় দিদিমনির কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আসছে টিঙ্কা। এমন সময় ফের সেই কান্নার আওয়াজ। কান্নাটা আগের চেয়ে আরো করুণ— 'আমাকে বাঁচাও!'
টিঙ্কা এবারেও চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। সকালের দেখা চারাটির পাতাদুটি এখন জলের তলায় ডুবে গেছে। গাছটা যেন বাতাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছে। এই চারাটি কী তবে কাঁদছে? দিদিমনি তো বললেন, গাছেরা কষ্ট পেলে কাঁদে। একটু টান দিতেই চারাটা টিঙ্কার হাতে চলে এল।
বাড়িতে এসে একটা ফাঁকা টবে চারাটিকে বসিয়ে দিল টিঙ্কা।
— এটা কী গাছ লাগিয়েছিস? পরদিন সকালে টিঙ্কার বাবা শুধালেন।
— জানি না। রাস্তার জমা জলে ডুবে ছিল, তুলে এনেছি।
— কই, দেখি দেখি? এটা হল ফলসা চারা। বেশ বড় গাছ হবে। এতটুকু টবে একে রাখা যাবে না। টিঙ্কার ঠাকুমা ভালো করে চারাটিকে দেখে বললেন।
— আগে বাঁচুক, পরে বড় টবে তুলে দিলেই হবে। টিঙ্কার বাবা বললেন।
পরদিন সকালে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে টিঙ্কা দেখল, সেই চারা গাছটি বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠেছে।
'ধন্যবাদ আমাকে বাঁচানোর জন্য!' সেই একই রকম গলায় কেউ যেন বলল। তবে গলাটা কাতর নয়, বরং বেশ খুশি খুশি।
— তুমি কথা বলতে পার? টিঙ্কা চুপিচুপি গাছের চারাটিকে জিজ্ঞেস করল।
— পারি। তবে আমাদের কথা কেউ শুনতে পায় না। আমি দু'দিন ধরে কত কাঁদছি, কেউ শুনতে পায়নি। আসলে আমাদের কথা কেউ ভাবেই না। জান, আমার চারপাশে কত আপনজন গাছ ছিল। তাদের ছায়ায় আমার থাকার কথা। এক এক করে তাদের সবাইকে কেটে ফেলা হল। তারপর থেকে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুমি না দেখলে আমিও মরে যেতাম। বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেলল চারাটি।
গাছের চারাটির কথা শুনে টিঙ্কারও চোখে জল চলে এল। সে বলল—
— কেঁদো না। এবার থেকে আমি তোমাদের সবার কথা ভাবব। কথা দিলাম।
— কার সঙ্গে কথা বলছিস রে, টিঙ্কা?
— কারও সঙ্গে নয়। এমনি।
মায়ের ডাকে চলে গেল টিঙ্কা। তবে তার মন পড়ে রইল ব্যালকনিতে— গাছবন্ধুর কাছে।
