তিন্নি এখন একা। এখন তার সামার ভ্যাকেশন চলছে। মা আর বাবা দুজনে চলে গেছে অফিসে।

এটা নতুন নয়। তিন্নির যখন থেকে একটু বড় হলো, বোধ জন্মাল তার ভিতর, তখনই সে অনুভব করল, সে একা। তার সকালে স্কুল। তখন বাবা-মা বাড়ি থাকে। তখন তো তিন্নির স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে বাড়ি যখন ঢোকে, তখন শিখা পিসি ছাড়া আর কেউ থাকে না।

সে দেখেছে, তার স্কুলে তার বন্ধুদের বাবা কিংবা মা স্কুল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে অধীর আগ্রহে। হাসিখুশি মুখ নিয়ে। কিন্তু তিন্নি দেখে, তার জন্য বাবা বা মা কেউ একজন দাঁড়িয়ে নেই। তখন তার ভীষণ কান্না পায়। কিন্তু সে চোখকে শাসন করে—একদম কাঁদবি না। কে তোর কান্না দেখতে আসছে?

আবার মা-বাবাকে বলেছে, তোমার কেউ একজন আমার জন্য স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে থাকো না কেন? তারা বলছেন—

— ওই সময় তো আমরা অফিসে থাকি, মা। কী করে তোমার স্কুলে যাই? তাই তো গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছি।

— গাড়ি আর তোমরা কি এক হলে?

তখনই তিন্নি বুঝে গেছে, তার জীবন একা একা। শিখা পিসি তাকে খেতে দেয়। অনেক দিন সে আধপেটা খেয়ে উঠে পড়ে।

পাড়ায় তার কোনো বন্ধু নেই। বাবা-মা বলেন—

— এখানের লোক তেমন সুবিধের নয়। এখানকার ছেলে-মেয়েরা তেমন ভালো নয়।

সে ঘরে বন্দি থাকে। তাদের জানালার উল্টোদিকে একটা পার্ক আছে। বিকেল হলে মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসে। কিন্তু তাকে কে নিয়ে যাবে?

সে শিখা পিসিকে বলেছে। শিখা পিসি বলছে—

— ওরে বাবা, আমি এ কাজ করতে পারি? তুমি তাদের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে নাও। আমি রোজ বিকেলে তোমাকে পার্কে নিয়ে যাব।

তিন্নি জানে, বাবা-মা সে পারমিশন দেবে না। মোবাইল তার ভালো লাগে না। তিন্নি এবার একোরিয়ামের দিকে তাকাল।

রেড মলি বলল—

— আমাদের এই বাক্সে বন্দি করে রেখেছে তোমার মা। এইটুকু জায়গায় আমরা থাকতে পারি? আমাদের জায়গা তো সমুদ্র। সাগর, মহাসাগর। আমাদের এখানে খুব কষ্ট হয়। তুমি দেখো না, আমাদের জন্য তুমি কী করতে পারো? তুমি একটু ভাবলেই পারবে। আমরা জানি, তুমি পড়াশোনায় খুব ভালো। তুমি ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হও।

তিন্নি বলে—

— তোমাদের মতো আমিও এই বাড়িতে বন্দি। আমি কী করতে পারি, বলো?

ব্ল্যাক মলি বলল—

— তুমি আমাদের মুক্তি দিতে পারো।

— কীভাবে? তিন্নি জিজ্ঞেস করল।

— তুমি একটু গভীরভাবে ভাবো। একটা উপায় বের হবে।

তিন্নি জানলার কাছে গেল। আকাশের দিকে তাকাল। নীল আকাশ বড় শান্ত। আকাশকেই প্রশ্ন করল, এদের মুক্তির কোনো পথ বলে দাও।

আকাশ বলল—

— আমি মেঘকে মুক্তি দিতে পারি। মাছকে পারি না।

আকাশ বিরস মুখে জানলার কাছ থেকে আবার একোরিয়ামের কাছে এসে দাঁড়াল।

— কী, কিছু উপায় খুঁজে পেলে? রেড মলি জিজ্ঞেস করল।

— না।

ছোট্ট উত্তর দিল তিন্নি।

— আমাদের ড্রেনের মুখে ছেড়ে দেবে। ব্ল্যাক মলি বলল।

— আমরা ঠিক সমুদ্রে চলে যাব। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। কী মজা! গোল্ডফিশ বলল।

তিন্নি কিছু সময় ভাবল। তারপর এক-একটা মাছকে জাল দিয়ে তুলে কাঁচের শিশিতে করে নিয়ে বাথরুমের জল যাওয়ার মুখে মাছগুলোকে ছেড়ে দিল। তারপর এক বালতি জল ঢেলে দিল। শিখা পিসি তখন ঘুমোচ্ছে।

তিন্নি জানে, মা তাকে বকবে। হয়তো মারবে। তবু তার আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে, মাছগুলো এখন নদী পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে চলেছে।

কতকাল পরে ওদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে!

কী মজাটাই না ওরা করবে! আর সে?