মিনু মানে মৃন্ময়ী, ক্লাস ফোরের ছাত্রী। আজ সকালে স্কুলে এসেছে। সব ছাত্রছাত্রী লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে। সব টিচাররাও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। হেডমাস্টারমশাই সুবিমলবাবু পতাকার দড়িতে টান দিয়েছেন। সবাই মিলে ‘বন্দেমাতরম্’ গাইছে। তক্ষুনি দারোয়ান কাকুকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল কজন কমবয়সি ছেলে। গেট ভেতর থেকে বন্ধ করে দুজন সেখানে বন্দুক হাতে দাঁড়াল। একজন হাতের বন্দুক থেকে আকাশে দুবার গুলি ছুড়ল। আর দুজন বন্দুক তাক করে রাখল ছাত্রছাত্রীদের দিকে।
চমকে উঠে সবাই গান থামালেও হেডমাস্টারমশাই ধীরে ধীরে পতাকার দড়িটা লোহার খুঁটিতে শক্ত করে বেঁধে বললেন,
— কে তোমরা? কী চাও?
— আমরা টাকা চাই। পাঁচ কোটি টাকা।
— কিন্তু অত টাকা আমাদের স্কুল কোথায় পাবে?
— আপনারা না পারলে সরকার দেবে। যতক্ষণ না টাকা পাব, আমরা আপনাদের বন্দি করে রাখব।
সুবিমলবাবু বললেন,
— স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানটা করতে দাও। তারপর তোমাদের কথা শুনব।
একটি ছেলে বলল,
— কোনও অনুষ্ঠান হবে না।
বলে বন্দুক দেখিয়ে সব ছাত্রছাত্রীকে আর সব টিচারদের মাঠের পাশে একটা ক্লাসরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে আটকে দিল। কেবলমাত্র হেডমাস্টারমশাই সুবিমলবাবু বাইরে। বললেন,
— আমি পুলিশকে ফোন করব।
— সেটা তো করতেই হবে। নাহলে টাকা পাব কী করে? করুন ফোন।
সুবিমলবাবু পুলিশকে ফোন করলেন। স্কুলে জঙ্গি হানা।
থানার বড়বাবু মিঃ সিং তাড়াতাড়ি তাঁর ফোর্স নিয়ে রেডি হলেন। লালবাজারে খবর গেল। পুলিশ কমিশনার ফোন করলেন হেডমাস্টারমশাইকে।
স্কুলের সবাইকে পণবন্দি করার খবর দ্রুতগতিতে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল। স্কুলের বাইরে নিউজ চ্যানেল আর পুলিশ বাহিনী চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
এদিকে বন্ধ ঘরের ভেতরে ছাত্রছাত্রীরা কেউ কাঁদছে, কেউ ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কেবল মিনু আর ক্যারাটে মিস সুমিতা নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছে।
সুমিতা মিস মিনুদের ক্যারাটে টিচার।
খুব তাড়াতাড়ি মিস সুমিতা আর মিনু তার বন্ধু চিনু, মানে চিন্ময়ী, ঘরের পেছন দিকে আলমারির পেছনে ঢুকে পড়ল।
অন্য ছাত্রছাত্রীরা চেঁচামেচি করছিল। দরজা খুলে একজন জঙ্গি ঢুকে পড়ল। বন্দুক তাক করে বলল,
— চুপ। একদম চেঁচামেচি নয়।
ভয়ে আতঙ্কে সব চুপচাপ। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
এদিকে আলমারির পেছনে লুকোনো দরজার সামনে মিনু, চিনু। মিস সুমিতা দরজার খিল শব্দ না করে খোলার চেষ্টা করছেন। অব্যবহারে দরজা খুলতে একটু শব্দ হয়েই গেল।
ঘরের ভেতরের জঙ্গি দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। চমকে পেছন ফিরে বলল,
— কিসের আওয়াজ হলো?
মিনু তাড়াতাড়ি আলমারিতে ছোট্ট ধাক্কা দিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
— আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। তাই আলমারিতে ধাক্কা লেগেছে।
তাচ্ছিল্য করে জঙ্গি বাইরে বেরিয়ে গেল, দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে। বাইরে হেডমাস্টারমশাইকে জঙ্গিরা ঘিরে রেখেছে। স্কুলের লাউডস্পিকারের মাধ্যমে জঙ্গিরা পুলিশের সাথে কথা বলছে। টাকা তাদের চাই। নাহলে এক ঘণ্টা পরে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে মেরে ফেলবে।
এদিকে মিনু, চিনু আর মিস ক্যারাটে পেছনের বাগান দিয়ে পেছনের দরজার সামনে। এদিকে কেউ ছিল না, কিন্তু একজন জঙ্গি বন্দুক হাতে একবার ঘুরে গেল। মিস সুমিতা পেছনের দরজার লক একটা লোহার রড দিয়ে ভেঙে ফেললেন। মিনু, চিনু বেরোতেই আবার সেই জঙ্গি এদিকে এলো। মিস সুমিতা গেটের থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন।
মিনু, চিনু বাইরে বেরিয়েই দৌড়ে দৌড়ে স্কুলের সামনের দিকে। পুলিশের গাড়ির সামনে হাঁপাতে হাঁপাতে দুজনে এসে বসে পড়ল। মিনুর বাবা বললেন,
— কী রে, মিনু? তোরা কী করে বাইরে এলি?
অফিসার মিঃ সিং ওদের সামনে বসে পড়লেন।
ভেতরের অবস্থা ওদের কাছ থেকে শুনে ইতিমধ্যে আসা কমান্ডো বাহিনী নিজেদের প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছেন।
তারপরের ইতিহাস—পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে বিনা রক্তপাতে স্কুলের সবাইকে উদ্ধার করা।
পুলিশ অফিসার মিঃ সিং আর কমান্ডো বাহিনীর চিফ মিঃ অরোরা নিউজ চ্যানেলে মিস সুমিতা আর তার দুই ছাত্রীর সাহসিকতার প্রশংসা করেই চলেছেন। সারা ভারতের নিউজ চ্যানেল স্বাধীনতা দিবসে ওদের সম্মান জানাচ্ছে।
এর মাঝে মিনু মানে মৃন্ময়ী বলে উঠল,
— স্যার, আমাদের তো আজ জাতীয় সংগীত গাওয়াই হল না।
সবাই একবাক্যে বলে উঠল,
— ঠিক, ঠিক!
তারপর? তারপর স্কুলের সবাই, পুলিশ বাহিনী, কমান্ডো বাহিনী, নিউজ চ্যানেলের সকলের সাথে গোটা ভারতবর্ষ একসাথে গেয়ে উঠল,
