কাকা শুভদীপ তাঁর চার বছরের ভাইপো পিকলাইকে কোলে বসিয়ে ভারতের স্বাধীনতা কী, সেটা বোঝাচ্ছেন।

— জানো, পিকলাইসোনা, আমাদের এই দেশ একসময় ব্রিটিশদের কাছে পরাধীন ছিল। ব্রিটিশরা প্রায় দুশো বছর আমাদের দেশ শাসন করেছে। আমাদের দেশের বীর শহীদেরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছেন।

পরাধীনতা কী, সেটা বুঝতে না পেরে পিকলাই আধোআধো বুলিতে শুভদীপকে বলল,
— পলাদিনতা কী, কাকাই?

শুভদীপ পিকলাইকে হেসেই জবাব দিলেন,
— পরাধীন মানে অন্যের অধীনে থাকা, পিকলাই। আমরা প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশদের কাছে পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের দেশে ব্যবসা করতে এসে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে যুদ্ধ করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। সেই থেকে ব্রিটিশরা বাংলা শাসন করতে শুরু করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের দেশ শাসন করেছিল।

পিকলাই আবার প্রশ্ন করে,
— ছিপাই বিদ্দোহ কী, কাকাই?

প্রিয় ভাইপোটিকে আদর করতে করতে শুভদীপ বললেন,
— তুমি বড়ো হয়ে ইতিহাস পড়ে সবই জানতে পারবে, পিকলাই। তারপর কী হল শোনো। সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ রানি সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করলেন। এরপর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশ ভাগ করার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। আগামীকাল পনেরোই আগস্ট। আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করব তিরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে ‘জয় হিন্দ’ বলতে বলতে। আজ থেকেই সবাই স্বাধীনতা দিবস পালন করার তোড়জোড় করছে। কাল তুমিও পতাকা হাতে বলবে, ‘জয় হিন্দ’।

পিকলাই আনন্দে হাততালি দিতে দিতে বলে উঠল,
— দয় ইন্দ, দয় ইন্দ।

সে এরপরই মায়ের কাছে গিয়ে আবদার ধরল,
— আমাকে এততা তিঙংগা পতাকা এনে দাও।

মা ছেলের কথা হেসে উড়িয়ে দিলেন। তাতেই পিকলাইয়ের জেদ আরও বেড়ে গেল। সে তিরঙ্গা পতাকার জন্য লাগাতার ঘ্যনঘ্যান করতে থাকল। শেষে দাদান নিজেই বিকেলে নাতির জন্য ছোট্ট একটা তিরঙ্গা পতাকা কিনে নিয়ে এলেন। শুধু কিনে নিয়ে এসেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। হাত খানেক লম্বা একটা লাঠির ডগায় ওই পতাকা ঝুলিয়ে পিকলাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন। পতাকা হাতে পাওয়া ইস্তক পিকলাই আধোআধো বুলিতে ‘দয় ইন্দ—দয় ইন্দ’ বলতে বলতে গোটা বাড়ি চক্কর দিতে শুরু করল।

পিকলাইয়ের ওই ‘দয় ইন্দ—দয় ইন্দ’ শুনতে শুনতে বাড়ির সকলের কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড় হল। অনেকক্ষণ সহ্য করতে করতে একসময় আর সহ্য করতে না পেরে বাবা ছেলেকে ধমক দিয়ে বললেন,
— তুমি এবার চুপ করবে, পিকলাই?

বাবার ধমকে পিকলাই এতটুকুও দমে না গিয়ে ‘দয় ইন্দ—দয় ইন্দ’ বলতে বলতে বাবার কাছে এসে এক গাল হেসে বলল,
— আমি প্যাকতিছ কত্তি, বাবা। হিহিহি।

বাবা ছেলেকে আর কীভাবে নিরস্ত করবেন ভেবে না পেয়ে চুপ করে গেলেন। মা রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনিও ছেলের ‘দয় ইন্দ—দয় ইন্দ’ শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে পিকলাইকে ধমক দিয়ে বললেন,
— তোমাকে আর প্যাকতিছ কত্তে হবে না, পিকলাই। রাত অনেক হল। এখন পতাকাটা রেখে খেতে বসবে। খাওয়াদাওয়া করে আমাকে উদ্ধার করো তুমি।

পিকলাই অমনি মায়ের মুখের সামনে তিরঙ্গা পতাকা নেড়ে দিয়ে বলল,
— দয় ইন্দ।

শুভদীপ সোফায় বসে টিভিতে সংবাদ দেখলেও তাঁর মন পড়ে আছে ছোট্ট মিষ্টি ভাইপোটির দিকে। মা পিকলাইকে বকাঝকা দিচ্ছেন দেখে তিনিও ভাইপোর সুরে সুর মিলিয়ে বলে উঠলেন,
— জয় হিন্দ।

মা এবার ছেলেকে ছেড়ে দেওরের ওপর হামলে পড়লেন,
— তুমিও পারো, শুভ! ছেলেটা এমনিতেই সবার কানের পোকা খাচ্ছে, এরপর ওকে আর উসকিও না তুমি।

কাকাইকে ধমক দিতে দেখে পিকলাই মায়ের চোখের সামনে আবার তিরঙ্গা পতাকাটা নাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— দয় ইন্দ।

মা এবার রেগে গিয়ে ছেলের হাত থেকে পতাকাটা কেড়ে নিয়ে আলমারির মাথায় তুলে দিলেন। পতাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শোকে পিকলাই কান্না জুড়ে দিল। পিকলাইকে কাঁদতে দেখে শুভদীপ সোফা থেকে উঠে এসে তাঁর প্রিয় ভাইপোটিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বললেন,
— তুমি এখনো পরাধীন, পিকলাই। আগে বড়ো হয়ে নিজে স্বাধীন হও, তারপর তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে দিনভোর ‘দয় ইন্দ—দয় ইন্দ’ কোরো। তখন কেউ আর তোমাকে বাধা দেবে না, সোনা।

শুভদীপের কথার কতটা কী বুঝল কে জানে! পিকলাই কান্না থামিয়ে কাকাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা গলায় বলল,
— দয় ইন্দ।

ভাইপোর চোখের জল মুছতে মুছতে শুভদীপও গলা ছেড়ে বলে উঠলেন,
— জয় হিন্দ। ভারতমাতা কী জয়।

দাদান নিত্যদিনের মতো সকালের বাসি সংবাদপত্রটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছিলেন। তিনি এবার সংবাদপত্র তুলে রেখে আলমারির মাথা থেকে তিরঙ্গা পতাকাটা নামিয়ে এনে নাতির হাতে দিয়ে বললেন,
— বন্দেমাতরম।

অগত্যা মাকেই রণে ভঙ্গ দিতে হল। তিনি রান্নাঘরে ফিরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বললেন,
— কচি, বুড়ো সবাই সমান। কাকে ছেড়ে কাকে দোষ দেব?

দাদান হাসতে হাসতেই মাকে বললেন,
— তুমি কিছু বললে, বউমা?

মা ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জিত মুখে বললেন,
— আমিও আপনার মতো বললাম, বন্দেমাতরম।